উপালির জন্ম কপিলাবস্তুর নিম্নকুলের নাপিত বংশে। তাঁর গৃহী নাম ছিল পূর্ণ। তাঁর মাতার নাম ছিল মস্তানী। পূর্ণ ছিলেন অনুরুদ্ধ, ভৃগু, কেম্বিল, ভদ্দীয়, আনন্দ, দেবদত্ত প্রমুখ রাজপুত্রের সহচর।
বুদ্ধ এক সময়ে অনুপ্রিয় নামক স্থানের আম্রবনে অবস্থান করছিলেন। সে সময় কয়েকজন রাজপুত্র ঠিক করলেন তাঁরা একত্রে বুদ্ধের নিকট গিয়ে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করবেন। এই ভেবে একদিন তাঁরা বুদ্ধের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। পূর্ণও তাঁদের সঙ্গী হলেন। কপিলাবস্তু থেকে কিছু দূরে এসে তাঁরা থামলেন। তারপর সকলে নিজেদের মূল্যবান পোশাক খুলে পূর্ণের হাতে তুলে দিলেন। তাঁরা বললেন, 'পূর্ণ! এসব তোমাকে দিলাম। তুমি কপিলাবস্তুতে ফিরে যাও।' এ বলে রাজপুত্ররা চলে গেলেন। পূর্ণ তখন ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। ভাবতে লাগলেন, কপিলাবস্তুতে ফিরে গিয়ে রাজপুত্রদের সংসার ত্যাগের কথা কীভাবে জানাবেন? তিনি আরও ভাবলেন, নাপিত বংশে আমার জন্ম। এই মূল্যবান পোশাক আমার উপযুক্ত নয়। তাছাড়া তাঁরা রাজপুত্র। তাঁদের বিপুল অর্থ, ধনসম্পদ, প্রভাব ও প্রতিপত্তি আছে। এসব ছেড়ে তাঁরা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করতে পারলে আমি কেন পারব না? আমার তো কিছুই নেই। এ বলে তিনি মূল্যবান পোশাকগুলো একটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে

রাজকুমারদের পথে পা বাড়ালেন। ইতোমধ্যে অনুরুদ্ধ, ভৃগু, আনন্দ প্রমুখ রাজকুমারগণ বুদ্ধের কাছে গিয়ে প্রব্রজ্যাধর্মে দীক্ষিত হওয়ার প্রার্থনা জানালেন। এমন সময় পূর্ণও এসে বুদ্ধকে কন্দনা করে প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করলেন। তখন রাজকুমারগণ বুদ্ধকে অনুরোধ করে বললেন, 'ভন্তে! আগে পূর্ণকে প্রব্রজ্যা দিন। তাহলে তাকে আমরা প্রণাম ও সম্মান করতে বাধ্য হবো। এতে আমাদের বংশমর্যাদা ও অহংকার দূর হবে।'
তাঁদের অনুরোধ শুনে বুদ্ধ খুশি হলেন। বুদ্ধ প্রথমে পূর্ণকে এবং পরে রাজকুমারদের প্রব্রজ্যা দান করেন। প্রব্রজ্যা গ্রহণ করার পর পূর্ণের নাম হয় উপালি।
প্রব্রজ্যা গ্রহণের কয়েক দিন পরই উপালি বুদ্ধের নিকট অরণ্যে বসবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু বুদ্ধ তাঁকে বুদ্ধের সঙ্গে থেকে ধর্ম বিনয় অনুশীলন করতে বললেন। উপালি বুদ্ধের উপদেশ অনুসরণ করে অতি অল্প সময়ে অর্হত্ব ফল লাভ করতে সমর্থ হলেন। বুদ্ধের সঙ্গে থেকে উপালি বিনয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন। বিনয়ে দক্ষতা দেখে বুদ্ধ তাঁকে 'বিনয়ধর' (নীতিজ্ঞানে সর্বশ্রেষ্ঠ) বলে ঘোষণা করেন।
একদিন উপোসথ দিবসে প্রাতিমোক্ষ আবৃত্তিকালে উপালি ভিক্ষুদের নিম্নরূপ উপদেশ দান করেন, 'প্রথম শিক্ষার্থী নব প্রব্রজিত কর্মফল ও রত্নত্রয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে গৃহ হতে বের হয়ে শুদ্ধ জীবন যাপনকারী, শৌর্যবান কল্যাণমিত্রের নিকট উপস্থিত হবেন। সঙ্ঘের মধ্যে বাস করবেন। জ্ঞানী ভিক্ষু বিনয় শিক্ষা করবেন। যোগ্য অযোগ্য বিষয়ে সুদক্ষ হবেন এবং তৃষ্ণা উৎপাদন না করে বাস করবেন।'
বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর আয়োজিত প্রথম মহাসঙ্গীতিতে উপালি বিনয় আবৃত্তি করেন। সেই মহাসঙ্গীতিতে পাঁচশত মহাজ্ঞানী অর্হৎ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা উপালির আবৃত্তি করা বিনয়ের যথার্থতা পরীক্ষা- নিরীক্ষা করেন। পরে এগুলো বিনয়পিটক নামে সংকলিত করা হয়। বুদ্ধ প্রদত্ত বিনয়ধর অভিধার মর্যাদা রাখতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। এটি তাঁর জীবনের পরম গৌরব। প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায় থাকলে মানুষের জীবনে অনেক কিছু করা সম্ভব। এর জন্য বংশমর্যাদার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সৎ কর্ম করার প্রচেষ্টা। উপালি থের র জীবনী থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই।
অনুশীলনমূলক কাজ |